Friday, October 23, 2020

ডঃ বাবাসাহেব ভীমরাও রামজি আম্বেদকর

ডক্টর ভীমরাও রামজি আম্বেডকর (১৪ই এপ্রিল ১৮৯১ - ৬ই ডিসেম্বর ১৯৫৬) ছিলেন একজন ভারতীয় জ্যুরিস্ট, রাজনৈতিক নেতা, বৌদ্ধ আন্দোলনকারী, দার্শনিক, চিন্তাবিদ, নৃতত্ত্ববিদ , ঐতিহাসিক, বাগ্মী, বিশিষ্ট লেখক, অর্থনীতিবিদ, পণ্ডিত, সম্পাদক, রাষ্ট্রবিপ্লবী ও বৌদ্ধ পুনর্জাগরণবাদী । তিনি বাবাসাহেব নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ভারতের সংবিধানের খসড়া কার্যনির্বাহক সমিতির সভাপতিও ছিলেন। তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী এবং ভারতের দলিত আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। ইনি ভারতের সংবিধানের মুখ্য স্থাপক।
সংক্ষিপ্ত পরিচয়


ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ভারতের গরীব “মহর” পরিবারে (তখন অস্পৃশ্য জাতি হিসেবে গণ্য হত) জন্ম গ্রহণ করেন। আম্বেদকর সারাটা জীবন সামাজিক বৈষম্যতার , “চতুর্বর্ণ পদ্ধতি”-হিন্দু সমাজের চারটি বর্ণ এবং ভারতবর্ষের অস্পৃশ্য প্রথার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হন এবং হাজারো অস্পৃশ্যদের থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্ম স্ফুলিঙ্গের মতো রূপান্তরিত করে সম্মানিত হয়েছিলেন। আম্বেদকরকে ১৯৯০ সালে মরণোত্তর “ভারতরত্ন” - ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় উপাধি'তে ভূষিত করা হয়। বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে, ভারতের মহাবিদ্যালয় শিক্ষা অর্জনে আম্বেদকর প্রথম “সমাজচ্যুত ব্যক্তি” হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন। অবশেষে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডিগ্রি (বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ উপাধি) লাভ করার পর, আম্বেদকর বিদ্বান ব্যক্তি হিসেবে সুনাম অর্জন করেন এবং কিছু বছর তিনি আইন চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, পরে তিনি ভারতের অস্পৃশ্যদের সামাজিক অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার উপর ওকালতির সময় সমসাময়িক সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন। কিছু ভারতীয় বৌদ্ধালম্বীদের দ্বারা তিনি “বোধিসত্ত্ব” (গৌতম বুদ্ধের পূর্ব জন্ম) উপাধিতে সম্মানিত হয়েছিলেন ,যদিও তিনি নিজেকে “বোধিসত্ত্ব” হিসেবে কখনো দাবি করেননি।

জীবন এবং শিক্ষা
'মোহ' অঞ্চলের (বর্তমান মধ্য প্রদেশ) এবং কেন্দ্রীয় সামরিক সেনানিবাসে ব্রিটিশ কর্তৃক স্থাপিত শহরে আম্বেদকর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন রামজী মালোজী শাকপাল এবং ভীমাবাইের ১৪তম তথা সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। তাঁর পরিবার ছিলেন মারাঠী অধ্যুষিত বর্তমান কালের “মহারাষ্ট্র”-এর রত্নগিরি জেলার “আম্বোভাদ” শহরে। তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিভুক্ত ছিলো (মহর জাতি), যারা (অস্পৃশ্য জাতি) হিসেবে এবং প্রচণ্ড রকম আর্থ-সামাজিক বিভেদ সাপেক্ষে পরিগণিত হত। আম্বেদকরের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট – ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনা এবং তাঁর পিতা “রামজী শাকপাল” মোহ সেনানিবাসের ভারতীয় সেনা নিবেদিত ছিলেন, তিনি সেকালে গতবাধা শিক্ষাপদ্ধতি থেকে মারাঠী এবং ইংরেজীতে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন এবং সেইসাথে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষা লাভে কঠোর পরিশ্রমে সন্তানদের উদ্বুদ্ধ করেন। কবির পান্থের মতে, রামজী শাকপাল তাঁর সন্তানদের হিন্দু সংষ্কৃতি পড়তে উদ্বুদ্ধ করতেন। সামরিক বাহিনীতে তিনি তাঁর জায়গা উপশালা ব্যবহার করতেন তাঁর সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশুনার কাজে, যখন তাঁরা তাদের জাতি বৈষম্যতার সম্মুখীন হত। যদিও আম্বেদকর বিদ্যালয়ে যেতেন সাথে একই অস্পৃশ্য জাতির অন্যরাও, তাদের আলাদা করে দেয়া হত এবং শিক্ষকগণ দ্বারা অমনযোগী ও অসহায়ক ছিলেন। তাদের শিক্ষাকক্ষের ভেতরে বসার অনুমতি ছিলো না, এমনকি তাদের যদি তৃষ্ণা পেতো উচ্চশ্রেণীর কোনো একজন এমন উচ্চতা হতে সেই পানি ঢেলে পান করাতো, যেহেতু তাদের (নিন্মশ্রেণীদের) কোনো অনুমতি ছিলো না, পানি স্পর্শ করার বা যেটি তা ধারণ করে। এই কাজটি সাধারণত আম্বেদকরের জন্য করতো বিদ্যালয়ের পিওন এবং যদি পিওন না থাকত বা না আসত তখন সারাদিন জল ছাড়াই কাটাতে হতো, আম্বেদকরের এই আবস্থাকে বলেছিলেন যেন - “পিওন নাই,পানি নাই”(নো পিওন, নো ওয়াটার)।

রামজী শাকপালের ১৮৯৪ সালে অবসর নেন ও দুই বছর পরে তাঁর পরিবার “সতর”-এ চলে আসে। জায়গা বদলের অল্পদিনের পরে, শিশু আম্বেদকরের মাতা মারা যান। তাঁরা (সন্তানরা) মাসীর সান্নিধ্যে কষ্টের পরিবেশে লালিত হন। শুধুমাত্র তিন ছেলে বালারাম, আনান্দ্রা ও ভীমরাও এবং দুই মেয়ে মঞ্জুলা ও তুলাসা'দের মধ্যে আম্বেদকরই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সামর্থ হন এবং মহাবিদ্যালয়ের স্নাতক লাভে সক্ষম হন। ভীমরাও শাকপাল আম্বেদকরের কূলনামটি (বর্ণনামূলক অতিরিক্ত নাম) এসেছে তাঁর “রত্নগিরি” নিজগ্রাম আম্বভাদ থেকে। তাঁর ব্রাহ্মণ শিক্ষক মহাদেব আম্বেদকর, যিনি তাঁর (আম্বেদকরের) প্রতি অত্যন্ত স্নেহ পরায়ণ ছিলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকায় তিনি নিজ গ্রাম আম্বোভাদকর থেকে পরিবর্তন করে আম্বেদকর রাখেন।

ভারতের সংবিধান খসড়ায় অবদান
১৫ই অগাস্ট ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার দিন, নব্য গঠিত কংগ্রেস শাসিত সরকার আম্বেদকরকে জাতির প্রথম আইন মন্ত্রী পদ পদার্পণ করেন, যা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। ২৯ই অগাস্ট, আম্বেদকরকে সংবিধান খসড়া সমিতির সভাপতি করা হয়, যা ভারতের নতুন মুক্ত সংবিধান রচনায় বিধানসভা কর্তৃক আরোপিত হয়। আম্বেদকর তাঁর সহপাঠীদের ও সমকালীন পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। এই কাজে আম্বেদকর প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মে সঙ্ঘের-চর্চা নিয়ে বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থে অধিক পড়াশোনাই অনেক সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিলো। ব্যালটের দ্বারা ভোট প্রদান, তর্ক-বিতর্কের ও অগ্রবর্তী নীতিমালা, করণীয় বিষয়সূচী, সভা-সমিতি ও ব্যবসায় সংক্রান্ত প্রস্তাবনা সমূহের ব্যবহার ইত্যাদি সংঘ চর্চা দ্বারা সমন্বয় সাধিত হয়। সংঘ চর্চা প্রাচীন ভারতের কিছু রাষ্ট্রীয় প্রজাতান্ত্রিক উপজাতিগোষ্ঠী যেমন শাক্যবংশ ও লিচ্ছবিররা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। অতঃপর আম্বেদকর যদিও তাঁর সাংবিধানিক অবয়ব তৈরিতে পশ্চিমা প্রণালীর ব্যবহার করেন, বস্তুত এর অনুপ্রেরণা ছিলো ভারতীয়, বাস্তবিকপক্ষে উপজাতীয়।

গ্রানভিলে অস্টিন আম্বেদকর কর্তৃক প্রণীত ভারতীয় সংবিধান খসড়াকে বর্ণনা দেন এভাবে “একনিষ্ঠ ও সর্বোত্তম সামাজিক নথি পত্র।”... 'অধিকাংশ ভারতের সাংবিধানিক শর্ত সরাসরি সামাজিক বিপ্লবের সমর্থনে উপনীত হয়েছে অথবা প্রয়োজনীয় শর্ত আরোপের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিপ্লবকে পরিপুষ্ট করার চেষ্টা। ' আম্বেদকর কর্তৃক লিখিত ভারতের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ও সুরক্ষা সর্বাধিক সাধারণ জনসাধারণের প্রতি প্রদান করা হয়েছে যেমন ধর্মীয় স্বাধীনতা, অস্পৃশ্যতা বিলোপ এবং সব ধরনের বৈষম্য বিধিবহির্ভূত করেন। আম্বেদকর নারীদের অধিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের জন্য যুক্তি প্রদর্শন করেন। তিনি এতে বিধানসভার সমর্থন অর্জন করে সিডিউল কাস্টেসভুক্ত নারী সদস্যদের বা সিডিউল উপজাতীয়দের জন্য বেসরকারি খাতে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় কর্মক্ষেত্রে চাকরির বিধান প্রদান করে নির্দিষ্ট আসনের ব্যবস্থা করেন, যা একটি সম্মতিসূচক পদক্ষেপ। ভারতের আইন প্রণেতারা আশা করেন এর মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক বিভাজন দূর হবে ও ভারতীয় অস্পৃশ্যরা সুযোগ-সুবিধা পাবে, যা ছিলো বস্তুত দৃষ্টিগোচরহীন যেমনটি যখন দরকার ঠিক তখনের মতো।

১৯৪৯ সালের ২৬ই নভেম্বর গণ-পরিষদ কর্তৃক সংবিধানটি গৃহীত হয়। আম্বেদকর ১৯৫১ সালে হিন্দু কোড বিল খসড়াটি সংসদের আস্তাবলে রাখার কারণে মন্ত্রী পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন, যা পৈতৃক সম্পত্তি, বিবাহ ও অর্থনীতি আইনের আওতায় লিঙ্গ সমতাকে ব্যাখ্যা করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নেহেরু, মন্ত্রীসভা ও অনেক কংগ্রেস নেতারা ইহাকে সমর্থন জানালেও বেশিরভাগ সাংসদ এর সমালোচনা করেন। আম্বেদকর স্বাধীনভাবে ১৯৫২'র নির্বাচনে লোকসভার হয়ে সাংসদে নিন্মপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, কিন্তু হেরে যান। তাঁকে পরে রাজ্যসভার উচ্চ পদস্থ সাংসদ পদে সমাসীন করা হয় ১৯৫২ সালের মার্চ মাসে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সদস্যপদে বহাল ছিলেন।

পরলোকগমন
১৯৪৮ সাল থেকে আম্বেদকর ডায়াবেটিস রোগে ভুগছিলেন। শারীরিক অবনতির জন্য ১৯৫৪ সালে জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তিনি শয্যাগত ছিলেন ও তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারান। রাজনৈতিক কারণে তিনি ক্রমবর্ধমানভাবে অনেক তিক্তবিরক্ত হয়ে উঠেন, যা তাঁর স্বাস্থ্যের কাল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫৫ সালের পুরোটা জুড়ে তিনি প্রচন্ডভাবে কাজ করার ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার অধিকতর অবনতি হয়। টানা তিন দিন “বুদ্ধ ও তাঁর ধর্ম” বইটির সর্বশেষ পান্ডুলিপি তৈরির পর বলা হয় যে, তিনি ৬ই ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালে তাঁর নিজ বাড়ি দিল্লীতে ঘুমন্ত অবস্থায় চির নিদ্রায় শায়িত হন।

বিবিধ
৭ই ডিসেম্বর তাঁর জন্য বৌদ্ধ ধর্মীয় আদলে দাদার চৌপাট্টি সমুদ্র সৈকতে একটি শাবদাহ নির্মাণ করেন। হাজারো শত অনুসারী, কর্মীবৃন্দ ও শুভানুধ্যায়ী ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হন। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালে একটি ধর্মান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যারা শাবদাহ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা একই স্থানে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

আম্বেদকর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সভিতা আম্বেদকর (বিবাহ পূর্ব নামঃ সার্দা কবির), তাঁর স্বামীর সাথে তিনিও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ২০০২ সালে বৌদ্ধালম্বী হিসেবেই মারা যান। উনার পুত্র ইশান্ত (অন্য নাম ভাইয়াসাহেব আম্বেদকর) ও তাঁর পুত্রবধূ মীরা তাই আম্বেদকর। আম্বেদকরের নাতি প্রকাশ যিনি ইন্ডিয়ান বুড্ডিস্ট অ্যাসোসিয়েশান এর জাতীয় সভাপতি। পূর্ব নাম বালাসাহেব ঈশান্ত আম্বেদকর, ভারতীয় "বাহুযান মহাসঙ্ঘ"এর নেতৃত্ব দেন এবং উভয় ভারতীয় লোকসভায় নিয়োজিত।

আম্বেদকরের ব্যক্তিগত মন্তব্য খাতায় ও কাগজে বহু অসমাপ্ত মুদ্রলিখন (টাইপস্ক্রিপ্টস) ও হাতে লেখা খসড়া পাওয়া যায়, পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা প্রকাশিত হয়েছিলো। যার মধ্যে ছিলো “ওয়েটিং ফর অ্যা ভিসা”, যার সম্ভাব্য লিখিত সময় ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৬ এর মাঝামাঝি এবং একটি আত্মজীবনচরিত ও “অস্পৃশ্য বা ভারতের গেটো শিশুরা” যেটি ১৯৫১'র আদমশুমার হিসেবে বিবেচিত।

আম্বেদকরের জন্য তাঁর দিল্লীসভা ২৬ আলীপুর রাস্তায় একটি স্মারক স্থাপিত হয়। তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করে আম্বেদকর জয়ন্তী বা ভীম জয়ন্তী হিসেবে পালিত হয়। তাঁকে মরণোত্তর ১৯৯০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ উপাধি “ভারত রত্ন” দেয়া হয়েছিল। তাঁর সম্মানে বহু সরকারি প্রতিষ্টানের নামকরণ করা হয় যেমন হায়দ্রাবাদের ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর ওপেন ইউনিভার্সিটি, আন্দ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম ডঃ বিআর আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি, মুজাফ্‌ফরপুরের বি আর আম্বেদকর বিহার ইউনিভার্সিটি এবং জালান্দরের বি আর আম্বেদকর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ও নাগপুরের ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শোনগাঁও বিমানবন্দর। ভারতের সংসদ ভবনে আম্বেদকরের একটি বিশাল প্রতিকৃতি প্রদর্শিত আছে।

সুত্রঃ উইকিপিডিয়া থেকে সংকলিত

গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা পদ্ধতি আইন ১৯৯৪

যে সব পরিবার মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন তারা মেয়ের জন্মের আগেই গর্ভপাত করতে চায়। পুত্রসন্তানকে গুরুত্ব দেওয়া হয় কারণ এ রকম একটা ধারণা রয়েছে যে, তারা বংশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, বয়স হলে বড়দের দেখাশোনা করবে এবং বিয়ের বয়সে পৌঁছলে পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না। ১৯৯৪ সালে ভারত সরকার কন্যাভ্রূণ হত্যা বন্ধ করার লক্ষ্যে গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা পদ্ধতি আইন পাস করে এবং ২০০২ সালে আইনটি সংশোধন করে।

এই আইন প্রথমত জিন সম্পর্কিত কাউন্সেলিং ক্লিনিক, জিন পরীক্ষাগার এবং জিনসম্পর্কিত ক্লিনিকগুলির নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা হাজির করে। এই ধরণের প্রতিটি ক্লিনিককে এই আইনে নথিভুক্ত হতে হয় এবং এই সব ক্লিনিকে যে সব চিকিৎসকরা কাজ করেন, তাঁদের অবশ্যই গর্ভাবস্থায় পরীক্ষানিরীক্ষা করার মতো উপযুক্ত প্রশিক্ষণ থাকতেই হবে। এই আইন মোতাবেক কোনও চিকিৎসক কর্তৃক গর্ভাবস্থায় লিঙ্গ নির্ধারণ বা লিঙ্গ নির্ধারণে সাহায্য করা নিষিদ্ধ।

কারখানা আইন ১৯৪৮

কারখানা আইন একটি বিস্তৃত ও দীর্ঘ আইন। কারখানায় কর্মরত শ্রমিক সম্পর্কিত বহু বিষয় এই আইনেয়ালচনা করা হয়েছে। এখানে এই আইনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য কী বলা আছে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই আইনে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত কোনও ব্যক্তিকে শিশু বলে ধরা হয়। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত তার বয়ঃসন্ধি বলে নির্দিষ্ট করা হয়। অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্করা হয় তার শৈশবে রয়েছে অথবা বয়ঃসন্ধিতে এই আইন অনুসারে কারখানায় কর্মরত সব অপ্রাপ্তবয়স্কের শারীরিক অবস্থার শংসাপত্র এক জন অনুমোদিত চিকিৎসক বা শল্য চিকিৎসককে দিতে হবে। যদি কোনও অপ্রাপ্তবয়স্ক এমন কোনও জায়গায় কাজ করে বা কাজ করতে শুরু করার অবস্থায় থাকে, যেখানে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে, সেখানেই এই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। এই আইন অনুসারে কোনও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি কোনও চলন্ত যন্ত্র পরিষ্কার করবে না বা সেখানে কোনও কোনও তৈলাক্ত পদার্থ দেবে না, কারণ তাতে তার আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

আমাদের সমাজে শিশুর অধিকার

জনসংখ্যার দিক থেকে আমাদের দেশ পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং শিশুর সংখ্যার দিক থেকেও আমরা চিনের পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছি। চারপাশে তাকালে এটা বুধতে অসুবিধা হয় না যে আমাদের শিশুদের জন্য শিশুর অধিকার সুনিশ্চিত করতে আমাদের বেশ কিছু পদক্ষেপ করা দরকার। এর মধ্যে প্রধান সমস্যাটা মেয়েদের নিয়ে এবং তাদের অধিকারকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি।

১০৯৮ টেলি হেল্পলাইন মডেল

চাইল্ডলাইন পরিষেবায় বছরের ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা এক জন বন্ধুত্বপূর্ণ ‘দিদি’ অথবা সহানুভূতিশীল ‘ভাইয়া’ দুর্বল শিশুদের সাহায্য করার জন্য ফোনের ও-প্রান্তে হাজির থাকেন। এটা এমন একটা ফোন নম্বর, যা ভারতের লক্ষ লক্ষ শিশুর মনে আশা জাগিয়েছে। যে সব শিশুর সাহায্য ও সহায়তা দরকার, তাদের জন্য চাইল্ডলাইন ভারতের প্রথম ২৪ ঘণ্টার বিনামূল্যের আপৎকালীন টেলিফোন পরিষেবা।
আপনি এক জন সহমর্মী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হোন বা তুমি এক জন শিশু হও, যে কেউই বিনা খরচের এই ১০৯৮ ডায়াল করে আমাদের পরিষেবা নিতে পারবেন। আমরা শুধু শিশুদের আপৎকালীন সমস্যায় সাহায্য করি তা-ই নয়, আমরা তাদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি দেখাশোনার ব্যবস্থা রয়েছে, এমন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করে দিই। এই টেলিফোন পরিষেবার মাধ্যমে আমরা ইতিমধ্যেই দেশের ৩০ লক্ষেরও বেশি শিশুর প্রয়োজন মেটাতে পেরেছি।

চাইল্ডলাইন এমন একটি মঞ্চ, যেখানে একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রক, টেলি যোগাযোগ মন্ত্রক, ফুটপাথবাসী ও সাধারণ যুব সমাজ, অলাভজনক সংস্থা , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট সংস্থা ও সহমর্মী ব্যক্তিত্বরা কাজ করছেন।

চাইল্ডলাইন সাধারণ ভাবে সকল শিশুর অধিকার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে। কিন্তু যে সব শিশুর যত্ন ও সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, এই পরিষেবা তাদের দিকেই বিশেষ ভাবে নজর দেয়, যার মধ্যে রয়েছে:

• পথশিশু এবং যে যুবক যুবতীরা রাস্তায় একা থাকে
• সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত শিশুশ্রমিক
• ঘরের কাজে নিযুক্ত শিশু, বিশেষত মেয়েরা
• বাড়িতে, স্কুলে বা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে শারীরিক/যৌন/মানসিক নিপীড়নের শিকার শিশুরা
• যে সব শিশুর সহমর্মিতা ও পরামর্শ প্রয়োজন
• যৌনকর্মীদের সন্তানরা
• গণিকাবৃত্তির শিকার শিশুরা
• পাচার হওয়া শিশুরা
• বাবা মা বা অভিভাবকদের দ্বারা পরিত্যক্ত শিশুরা
• হারিয়ে যাওয়া শিশুরা
• পালিয়ে যাওয়া শিশুরা
• কোনও মাদক দ্রব্যে আসক্ত শিশুরা
• অন্য ভাবে সক্ষম শিশুরা
• আইনের সঙ্গে লড়াইয়ে রত শিশুরা
• বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রয়েছে এমন শিশুরা
• মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী শিশুরা
• এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত শিশুরা
• সংঘর্ষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার শিশুরা
• যে সব শিশু রাজনৈতিক উদ্বাস্তু• যে সব শিশুর পরিবার কোনও সংকটের মধ্যে রয়েছে
যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চাইল্ডলাইনের সৃষ্টি
ভারত একটি শিশু-বান্ধব দেশ হয়ে উঠুক, যেখানে সকল শিশুর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত থাকবে।

অংশগ্রহণের অধিকার

অনুচ্ছেদ ১৫ (যোগ দেওয়ার স্বাধীনতা)
অন্যের অধিকারে ব্যাঘাত না ঘটালে প্রতিটি শিশুরই তথ্য পাওয়া ও তা ভাগ করে নেওয়ার অধিকার এবং এক সঙ্গে মেলামেশা ও কোনও সংগঠনে যোগ দেওয়ার অধিকার আছে।

অনুচ্ছেদ ১৩ (ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা)
যা ভাবছে তা বলার অধিকার প্রতিটি শিশুর আছে এবং যে কোনও ধরনের তথ্য খোঁজা বা পাওয়ার অধিকার তার আছে, যতক্ষণ তা আইনের পরিধির মধ্যে রয়েছে।

অনুচ্ছেদ ১৬ (গোপনীয়তার অধিকার)
প্রত্যেক শিশুর গোপনীয়তার অধিকার আছে। তার জীবন, পরিবার বা বাড়ির ওপর আঘাত এলে আইনের উচিত তাকে রক্ষা করা।

অনুচ্ছেদ ১৭ (গণমাধ্যম থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ)
গণমাধ্যম থেকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে প্রতিটি শিশুর। তারা বুঝতে পারে এমন তথ্য টেলিভিশন, রেডিও ও সংবাদপত্রের দেওয়া উচিত এবং তাদের ক্ষতি হতে পারে এমন কিছু সরবরাহ করা উচিত নয়।

বাঁচার ও বিকাশের অধিকার

অনুচ্ছেদ ৭ (নিবন্ধীকরণ, নাম, জাতীয়তা, যত্ন)
প্রতিটি শিশুর আইনগত ভাবে নিবন্ধীকৃত নাম ও জাতীয়তার অধিকার আছে। তার জানার অধিকার আছে এবং যতদূর সম্ভব বাবা-মায়ের যত্ন পাওয়ার অধিকার আছে।

অনুচ্ছেদ ৯ (বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা)
বাবা-মায়ের কাছ থেকে কোনও শিশুর বিচ্ছিন্ন থাকা উচিত নয়, যদি না সেটা তার ভালোর জন্য হয়। (উদাহরণ হিসেবে, কোনও বাবা বা মা যদি সন্তানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বা অবহেলা করেন)। বাবা-মা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, শিশুর অধিকার আছে তাঁদের সংস্পর্শে থাকার, যদি না তাতে তার কোনও ক্ষতি হয়।

অনুচ্ছেদ ২০ (পরিবার থেকে বঞ্চিত শিশু)
শিশুর পরিবার যদি তার দেখভাল করতে না পারে, তা হলে তার ধর্ম, সংস্কৃতি, ও ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা আছে এমন লোক যাতে তার যথাযথ দেখাশোনা করতে পারেন তা সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে।

অনুচ্ছেদ ২২ (উদ্বাস্তু শিশু)
কোনও শিশু উদ্বাস্তু হিসেবে কোনও দেশে এলে, সেই দেশের শিশুর সমান অধিকার তার থাকবে। বাস্তুহারা শিশুকে তার পরিবারের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য যতদূর সম্ভব যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

অনুচ্ছেদ ২৩ (প্রতিবন্ধকতা)
প্রতিবন্ধী শিশুরও সমাজে সক্রিয় ভূমিকা-সহ সম্মানের সঙ্গে একটি সুন্দর স্বাধীন জীবন যাপনের অধিকার আছে। এ ধরনের জীবন যাপনে বিশেষ যত্ন ও উৎসাহ পাওয়ার অধিকার তার আছে।

অনুচ্ছেদ ২৪ (স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য পরিষেবা)
প্রতিটি শিশু যাতে সুস্থ থাকতে পারে তার জন্য সে ভালো স্বাস্থ্য পরিষেবা, পরিষ্কার জল, পুষ্টিকর খাদ্য ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাওয়ার অধিকারী।

অনুচ্ছেদ ২৫ (দেখভালের পর্যালোচনা)
বাবা-মায়ের পরিবর্তে কোনও শিশুর দেখভাল যদি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (হাসপাতাল, হেফাজত ইত্যাদি) করেন, তা হলে সেই অবস্থা নিয়মিত পর্যালোচনা করানোর অধিকার সেই শিশুর আছে।

অনুচ্ছেদ ২৬ (সামাজিক নিরাপত্তা)
কোনও শিশু গরিব হলে বা তার কোনও প্রয়োজন থাকলে, সরকারের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার অধিকার তার আছে।

অনুচ্ছেদ ২৭ (জীবনের যথোপযুক্ত মান)
শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট ভালো জীবন যাপনের অধিকার প্রতিটি শিশুর আছে। শিশুর পরিবার যদি তার ব্যবস্থা করতে না পারে, তা হলে সরকারের সব রকম সাহায্য করা উচিত।

অনুচ্ছেদ ২৮ (শিক্ষার অধিকার)
প্রতিটি শিশুর শিক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। প্রাথমিক শিক্ষা হবে নিখরচায়। প্রতিটি শিশুকে মাধ্যমিক শিক্ষা দিতে হবে।

অনুচ্ছেদ ২৯ (শিক্ষার লক্ষ্য)
শিক্ষা শিশুর ব্যক্তিত্ব ও মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটায়। পাশাপাশি মানবাধিকার, বাবা-মা, নিজের ও অন্যের সংস্কৃতি এবং পরিবেশের প্রতিও শ্রদ্ধা জাগায়।

অনুচ্ছেদ ৩০ (সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশু)
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মানুক বা না-ই মানুক, নিজের ভাষা শেখা ও ব্যবহার করা এবং পরিবারের প্রথা ও ধর্ম পালন করার অধিকার প্রতিটি শিশুর আছে।

অনুচ্ছেদ ৩১ (অবসর, খেলা ও সংস্কৃতি)
জিরোনো, খেলা করা এবং সাংস্কৃতিক ও পাঠক্রম-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়ার অধিকার সব শিশুর আছে।

অনুচ্ছেদ ৪২ (অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা)
সরকারের উচিত এই সনদের কথা প্রতিটি শিশু ও তার বাবা-মাকে জানানো।

সকলের জন্য শিক্ষা (ইএফএ)

সকলের জন্য শিক্ষা একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার। প্রতিটি শিশু, তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যাতে উপযুক্ত প্রাথমিক শিক্ষা পান, তার জন্যই বিশ্বব্যাপী এই আন্দোলনের সূত্রপাত। ১৯৯০ সালে শিক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক অধিবেশনে সর্বশিক্ষা অভিযানের নীতি গ্রহণ করা হয়।

অনেক বছর কেটে গেছে। আজও বহু দেশ সর্বশিক্ষার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। সেনেগালের রাজধানী ডাকারে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ফের মিলিত হন। তাঁরা ঠিক করেন, ২০১৫ সালের মধ্যে সর্বশিক্ষার লক্ষ্যে তাঁরা পৌঁছবেন। শিক্ষা অভিযানের ছ’টি লক্ষ্য তাঁরা চিহ্নিত করেন, যার উদ্দেশ্য ২০১৫-এর মধ্যে শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষাসংক্রান্ত সব রকম চাহিদা মেটানো।

এই অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছে ইউনেস্কো। শিক্ষাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলি সুসংহত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তারা। সরকার, উন্নয়নের কাজে যুক্ত নানা সংস্থা, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যম প্রভৃতির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ইউনেস্কো সর্বশিক্ষা অভিযানের মূল লক্ষ্যে পৌঁছনোর চেষ্টা করে চলেছে।

বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে আটটি লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এর পোশাকি নাম মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল (এমডিজি)। ২০১৫ সালের মধ্যে সকলের জন্য শিক্ষার লক্ষ্যে যে অভিযান চলছে, তা আন্তর্জাতিক উন্নয়নের লক্ষ্যেও এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে, বিশেষ করে, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ক এমডিজি ২ এবং শিক্ষায় লিঙ্গসমতা বিষয়ক এমডিজি ৩-এর লক্ষ্যে।

শিক্ষা একটি মৌলিক ও মানবিক অধিকার

ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি মানুষের শিক্ষার অধিকার রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার কতগুলি মূলনীতি হল – প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্র অবশ্যই অবৈতনিক হবে এবং বাধ্যতামূলক হবে। প্রযুক্তিগত শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা সাধারণ ভাবে লভ্য হবে এবং উচ্চশিক্ষা মেধানুসারে প্রত্যেকের কাছে গ্রহণীয় হবে। শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশে যেমন সাহায্য করে তেমনই মানুষকে তার অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন করে। কী ধরনের শিক্ষা ছেলেমেয়েদের দেওয়া হবে এ ব্যপারে অবশ্যই অভিভাবকদের নিজস্ব পছন্দকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বনবিদ্যা

বনবিদ্যা (ইংরেজি: Forestry) হল মানুষের কল্যাণের তরে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য, চাহিদা, এবং মান মেটাতে অরণ্য ও তৎসংশ্লিষ্ট সম্পদের সৃষ্টি, ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং মেরামতের বিজ্ঞান, কলা ও কৌশল। আবাদি জমি অথবা প্রাকৃতিক স্ট্যান্ডে বনবিদ্যার চর্চা করা হয়। বনবিদ্যার প্রধান লক্ষ্য হল এমন পদ্ধতির প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যা পরিবেশগত জোগান ও পরিষেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে অরণ্যের সুব্যবস্থাপনা করবে। নির্বিঘ্ন অথবা ক্ষতির সম্মুখীন যেকোনো সম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে একে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মতো পদ্ধতির প্রণয়নই অরণ্যবিদ্যার সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।
বনচাষ নামক সংশ্লিষ্ট একটি বিজ্ঞানে স্ট্যান্ড পর্যায়ে বৃক্ষ ও অরণ্যের পুনরুৎপাদন, পরিচর্যা এবং সংগ্রহ সম্বন্ধে আলোকপাত করা হয়। আধুনিক বনবিদ্যার বিষয়ের পরিসর অত্যন্ত ব্যাপক যাতে বাস্তুতন্ত্র পরিষেবার প্রসঙ্গটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাস্তুতন্ত্রের পরিসেবাসমূহ অরণ্য সংরক্ষণের নিমিত্তে কাষ্ঠল দ্রব্যের জন্য কাঁচামালস্বরূপ কাঠ, বন্যপ্রাণীর বাসস্থান, প্রাকৃতিক জলের গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ, জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা, ভূমিক্ষয় নিয়ন্ত্রণ, এবং বায়ুমন্ডলীয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সিংক বা ডুবা হিসেবে অরণ্যকে সহায়তা করে। যিনি বনবিদ্যা অনুশীলনের সাথে যুক্ত থাকেন তাকে বনবিদ বা ফরেস্টার বলা হয়। অরণ্য বাস্তুতন্ত্রগুলোকে জীবমন্ডলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়। সেইসাথে বনবিদ্যা এখন বিজ্ঞান, ফলিত কলা এবং প্রযুক্তির অত্যাবশ্যক ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে।

ইতিহাস
পঞ্চম শতকে মঠধারী সন্ন্যাসীরা জ্বালানি ও খাদ্যের উৎস হিসেবে আড্রিয়াটিকের উপকূলে তখনকার বাইজেন্টাইন রোমানিয়াতে প্রস্তর পাইনের আবাদ করেন। ১৩০৮ খ্রিষ্টাব্দে দান্তে আলিগিয়েরির রচিত কবিতা ডিভাইন কমেডিতে সর্বপ্রথম এ ধরনের বনায়নের উল্লেখ পাওয়া যায়।তারও আগে সপ্তম শতকে যখন কাঠের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দেখা দেয়, ভিজিগোথরা ওক এবং পাইন বনের সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রথাবদ্ধ নিয়মাবলির প্রবর্তন করে, আর তার ফলেই প্রথাগত বনবিদ্যার অনুশীলন শুরু হয়। চীনে নানান রকম বনজ সম্পদের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার ইতিহাস বেশ প্রাচীন- সেই হান সাম্রাজ্যের আমল থেকে। তখন জমিদারদের অধীনে বনব্যবস্থাপনা হত। এই বিষয়টি মিং সাম্রাজ্যের চীনা পন্ডিত জু গুয়াংকি (১৫৬২-১৬৩৩) পরবর্তীতে তাঁর লেখায় তুলে ধরেন। ইউরোপে ভূমির নিয়ন্ত্রণের মধ্যে শিকারের অধিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, এবং যদিও অনেক স্থানে কৃষিজীবীরা অরণ্য থেকে জ্বালানি কাঠ ও ঘরবাড়ি তৈরীর কাঠ সংগ্রহ করতে পারত, তথাপি শিকারের অধিকার একমাত্র অভিজাতদের জন্যই নির্ধারিত ছিল। কাঠের টেকসই উৎপাদনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক বন ব্যবস্থাপনার শুরু হয় চতুর্দশ শতকে জার্মানিতে (যেমন, নুরেমবার্গ) এবং ষোড়শ শতকে জাপানে হয়েছিল। বৈশিষ্ট্যস্বরূপ, একটা অরণ্যকে নির্দিষ্ট কতক খন্ডে ভাগ করার পর মানচিত্রায়িত করা হতো; কাঠ সংগ্রহের পরিকল্পনা নেয়া হতো মূলত চারা পুনরুৎপাদনের দিকে খেয়াল রেখে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণজনিত উদ্বেগ ও লগিং কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার প্রতি সাড়া প্রদান করে বিশ শতকে এসে পশ্চিমা জাতিসমূহ অরণ্য আইন এং বাধ্যতামূলক প্রবিধানের প্রণয়ন ও বিবর্তন ঘটাতে শুরু করে।
ক্রান্তীয় বনবিদ্যা হল বনবিদ্যার একটি আলাদা শাখা যা মূলত নিরক্ষীয় অরণ্যগুলো নিয়ে আলোকপাত করে। স্যার ডিয়েট্রিখ ব্রান্ডিসকে ক্রান্তীয় বনবিদ্যার জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়।

বিজ্ঞান হিসেবে বিগত শতাব্দীগুলোতে বনবিদ্যাকে পৃথক বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হতো। বাস্তুবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞানের উঠে আসার সাথে সাথে ফলিত বিজ্ঞানগুলোকে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এই মতের সাথে সঙ্গতি রেখে বনবিদ্যাকে প্রাথমিক তিনটি ভূমি-ব্যবহার বিজ্ঞানের একটি হিসেবে ধরা হয়। বাকি দু’টি হলো কৃষি শিক্ষা ও কৃষিবনবিদ্যা। প্রাকৃতিক অরণ্য ব্যবস্থাপনার মৌলিক সূত্রগুলো মূলত এসকল শিরোনামের অধীনে প্রাকৃতিক বাস্তুবিদ্যার বৈশিষ্ট্য নিয়েই এসেছে। বাস্তুবিদ্যা আর কৃষিবাস্তুবিদ্যার মূলনীতির সমণ্বয়কে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা করা হয় বনবিদ্যা বা বনায়নের যার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে বনজদ্রব্যের সুষ্ঠু আহরণ।

আধুনিক বনবিদ্যা চর্চা
আজকালকার দিনে অরণ্য বাস্তুতন্ত্রগুলোর ব্যবস্থাপনা এবং বৃক্ষ প্রজাতি ও প্রকরণের জিনগত মানোন্নয়নের জন্য বেশ শক্তিশালি গবেষণা ক্ষেত্র বিদ্যমান। বনবিদ্যার আওতায় রয়েছে আবাদ, সংরক্ষণ, পাতলাকরণ, নিয়ন্ত্রিত দহন, বৃক্ষপতন, আহরণ এবং তক্তার প্রক্রিয়াকরণের উত্তম পদ্ধতি প্রণয়ন। আধুনিক বনবিদ্যার অন্যতম প্রয়োগ হচ্ছে পুনর্বনায়ন, যেখানে একটি এলাকায় বৃক্ষের আবাদ ও পরিচর্যা করা হয়।

অনেক অঞ্চলের বাস্তুতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বনজশিল্পের রয়েছে মূখ্য অবদান। ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে তৃতীয়-পক্ষ যাচাইকরণ প্রথা বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অরণ্যের সুস্থতার নিমিত্তে ন্যস্তভার এবং টেকসই বনবিদ্যার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করাই এসকল তৃতীয় পক্ষের কাজ। এ ধরনের যাচাইকরণ পদ্ধতি বস্তুত কতিপয় বনবিদ্যার অনুশীলন, বিশেষত, উন্নত বিশ্বে সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্বেগের সাথে সাথে স্বল্পোন্নত অঞ্চলে নির্বনায়নের কঠোর সমালোচনার প্রতি সাড়া প্রদান করে প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে প্রাথমিকভাবে বাজারের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করা এবং দাবিকৃত স্বাধীনতার অপ্রতুলতার জন্য কয়েকটি যাচাইকরণ পদ্ধতির সমালোচনা করা হয়।

ভূসংস্থানিকভাবে কঠোর জঙ্গলাকীর্ণ ভূখন্ডে বিপজ্জনক ভূমিক্ষয় বা এমনকি ভূমিধ্বস প্রতিরোধ অথবা হ্রাসের জন্য সঠিক বনবিদ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। যেসব এলাকায় ভূমিধ্বসের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি, সেসব জায়গার বন মাটিকে আটকে ধরে স্থির রাখে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

বনের অব্যবস্থাপনা এবং তক্তা ছাড়াও এর অন্যান্য পরিষেবার দিকগুলো, যেমন আদিবাসি অধিকার, মনোরঞ্জন, জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা, এবং জঙ্গল, পানিপথ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, সম্বন্ধে ব্যাপক উপলব্ধির ফলে জনসাধারণের মাঝে বন ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কাষ্ঠল দ্রব্যাদির চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে দাবানল, লগিং, মোটরচালিত মনোরঞ্জন এবং অন্যান্য বিষয়গুলোর ভূমিকার প্রতি সুস্পষ্ট মতানৈক্য তর্কের অবকাশ সৃষ্টি করে।

বনবিদ
চিলির সান পাবলো দে ত্রেগার ভালভিদিয়ান বনে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অভ চিলির বনবিদরা/ বনকর্মীরা মূলত তক্তাশিল্প, সরকারি সংস্থা, সংরক্ষণ গোষ্ঠী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, শহুরে উদ্যান সমিতি, নাগরিক সঙ্ঘ, এবং বেসরকারী জমিদারদের হয়ে কাজ করেন। পেশাদার বনপালদের কাজের ব্যাপ্তি ব্যাপক ও বিচিত্র যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক উপাধি থেকে শুরু করে পিএইচডি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন পড়ে। শিল্পসংক্রান্ত বনবিদরা সযত্ন আহরনসহ অরণ্যের পুনরুৎপাদনের পরকল্পনায় নিযুক্ত থাকেন। শহুরে বনবিদরা নগরের সবুজ চত্বরে বৃক্ষ ব্যবস্থাপনা করেন। যারা বৃক্ষ নার্সারিতে কাজ করেন তারা কাষ্ঠভূমি তৈরী অথবা পুনরুৎপাদন প্রকল্পের জন্য চারাগাছ ফলান। বনবিদরা বৃক্ষের জিনতত্ত্ব মানোন্নয়নে নিয়োজিত থাকেন। অরণ্য প্রকৌশলিরা নতুন ধরণের স্থাপনার প্রবর্তন করেন। এছাড়াও পেশাদার বনবিদরা ভৌগলিক তথ্য ব্যবস্থার মতোন উপকরণের সহায়তায় অরণ্যের বৃদ্ধি পরিমাপ ও মডেল তৈরী করেন। অরণ্যে কীটের উপদ্রব, রোগবালাই, বন ও তৃণভূমির দাবানল কমাতেও বনবিদরা কাজ করেন, তবে যদি মহামারী অথবা জানমালের ক্ষতির সম্ভাবন কম থাকে, বেশিরভাগ সময়ই তারা বনের বাস্তুতন্ত্রের এসব প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিকভাবে ঘটতে দেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং জলবিভাজিকা রক্ষায়ও বনবিদদের বিচরণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।বনবিদরা প্রধানত কাঠ ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে পুনর্বনায়ন, বনকে সবচাইতে ভালো অবস্থায় রাখা এবং দাবানল নিয়ন্ত্রনে সংশ্লিষ্ট থাকেন।

বনজ পরিকল্পনা নকশাকৃত সম্পদের তথ্যতালিকার সহায়তায় বনবিদরা বন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়ন করে থাকেন। তথ্যতালিকায় সাধারণত একটা এলাকার ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রজাতি অনুযায়ী বৃক্ষ ও অন্যান্য উদ্ভিদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বা বিস্তারণের তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে। পরিকল্পনাতে ভূমিমালিকের উদ্দেশ্য, সড়ক, সাঁকো, মনুষ্যবসতির সংলগ্নতা, জলের বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা, এবং মৃত্তিকার তথ্যের ব্যাপারে অবগত হতে হয়। এছাড়াও পরিকল্পনাতে বিশেষভাবে বনপালনসংক্রান্ত ব্যবস্থাপত্র এবং এর বাস্তবায়নের উপযুক্ত সময় নির্বাচনের বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সেই সাথে ভূমিমালিকের উদ্দেশ্য এবং বাস্তুগত, অর্থনৈতিক, লজিষ্টিক (যেমন, সম্পদে প্রবেশ) ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন সম্পদের সম্ভাব্য ভবিষ্যত দশার সুপারিশসমূহ বন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একইসাথে, প্রক্রিয়াকরণ ও বিক্রির কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনাতে গুণগত মানসম্পন্ন বনজ দ্রব্যের উৎপাদনের উপর জোর দেয়া হয়। এভাবেই বৃক্ষ প্রজাতি এবং এর পরিমাণ ও ধরণ, যা মূলত আহরিত দ্রব্যের মান এবং সংখ্যার উপর নির্ভরশীল, বনপালনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে।

একটি ভালো ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায়, যেকোনো সুপারিশকৃত আহরণ রীতি পালনের পর স্ট্যান্ডের ভবিষ্যত দশা ছাড়াও ভবিষ্যত ব্যবস্থাপত্র (বিশেষ করে অন্তর্বর্তী স্ট্যান্ড উন্নয়নমূলক কার্যাবলী), এবং চূড়ান্ত আহরণের পর প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম পুনরোৎপাদনের পরিকল্পনার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হয়।

ভূমিমালিক ও ইজারাদারদের উদ্দেশ্য সাধারণত এইসব পরিকল্পনা ও পরবর্তী জমির মানোন্নয়ন কার্যাবলিকে প্রভাবিত করে। ব্রিটেনে “উপযুক্ত বনবিদ্যা অনুশীলন” - এই মূলনীতিকে প্রতিপাদ্য করে পরিকল্পনায় আবশ্যিকভাবে অন্যান্য উপকারভোগী, যেমন জঙ্গলের ভেতরে অথবা আশেপাশে বসবাসকারি সংলগ্ন গোষ্ঠী অথবা গ্রামীণ আবাসিকদের, প্রয়োজনের দিকগুলো বিবেচনায় রাখা হয়। পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বনবিদরা বৃক্ষ ভূপাতন এবং পরিবেশগত আইনকানুনের বিষয়াদি মাথায় রাখেন। টেকসই আহরণ ও বৃক্ষের প্রতিস্থাপন সম্পর্কে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাগুলো নির্দেশনা দেয়। কোনো ধরনের সড়ক নির্মাণ বা বন প্রকৌশলগত ক্রিয়াকলাপের প্রয়োজন থাকলে সে সম্পর্কে পরিকল্পনাগুলো অবগত করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের আইনকানুনগুলো কীভাবে সংশ্লিষট কর্মকান্ডকে প্রভাবিত করবে, সে বিষয়টি কৃষি ও অরণ্যের নের্তৃবৃন্দ বুঝার চেষ্টা করছেন। প্রাপ্ত তথ্যসমূহ এমনসব উপাত্ত দেবে যেগুলো নতুন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণমূলক তন্ত্রে কৃষি ও বনবিদ্যার ভূমিকাকে নির্ধারণ করে দেবে।

বনবিদ্যা শিক্ষার ইতিহাস
বনবিদ্যার প্রথম নিবেদিত শিক্ষাঙ্গনটি জর্জ লুডভিগ হার্টিগের হাত ধরে ১৭৮৭ সালে জার্মানির হেস রাজ্যের ভেটাআও-এর হাঙ্গেন-এ প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও এর আগেই হেস-ডারমষ্টাড-এর গিসেন বিশ্ববিদ্যালয়সহ মধ্য ইউরোপে এ বিষয়ে পড়ানো হতো।

স্পেনে বনবিদ্যার প্রথম বিদ্যালয়টি ছিল ১৮৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ফরেস্ট এঞ্জিনিয়ারিং স্কুল অভ মাদ্রিদ (এস্কুয়েলা তেকনিকা সুপেরিয়র দে ইনহেনিয়েরোস দে মোন্তেস)।

জর্জ ওয়াশিংটন ভ্যান্ডারবিল্টের বাল্টিমোর এষ্টেটের মাটিতে নর্থ ক্যারোলাইনার এ্যাশভিলে ১৮৯৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর কার্ল আলউইন শেঙ্ক-এর মাধ্যমে উত্তর আমেরিকার সর্বপ্রথম বনবিদ্যালয় হিসেবে বিল্টমোর বনবিদ্যালয় প্রতিষ্টিত হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পরে ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউইয়র্ক রাজ্য বনমহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পায়। উনিশ শতকের প্রথম ভাগে উত্তর আমেরিকার বনবিদরা জার্মানিতে বনবিদ্যার উপর পড়াশোনার জন্য জার্মানিতে যান। এছাড়াও, প্রথমদিককার কয়েকজন জার্মান বনবিদ উত্তর আমেরিকাতে| স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন।

দক্ষিণ আমেরিকায় প্রথম বনবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রাজিলের মিনা জেরাইসের ভিচোজাতে ১৯৬২ সালে, যা পরের বছর কুরিতিবা’র পারানা ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদ হিসেবে স্থানান্তর করে।

বনবিদ্যা শিক্ষার বর্তমান চালচিত্র জ্বালানির ভার কমাতে বনবিদরা নিয়ন্ত্রিত দহন পদ্ধতি অবলম্বন করেন এখনকার দিনে বনবিদ্যার পড়াশোনায় সাধারণত জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, জলবায়ু বিজ্ঞান, পানিবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং বন ব্যবস্থাপনার উপর হাতে কলমে শিক্ষায় দেয়া হয়। তাছাড়া, সামাজিকবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণার উপর শিক্ষা, উপরি সুবিধা হিসেবে গণ্য হয়।

ভারতে বনবিদ্যার উপর লেখাপড়া ভার মূলত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আর বন গবেষণা ইনস্টিটিউটসমূহের (বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো) উপর ন্যস্ত। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে চার বছরের ডিগ্রী কার্যক্রম চালানো হয়। মাষ্টার্স ও ডক্টরেট ডিগ্রীও এসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান।

যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান বনবিদ সমিতির অধিভুক্তিতে বনবিদ্যা সংক্রান্ত শিক্ষার অংশ হিসেবে মাধ্যমিকোত্তর ব্যাচেলর এবং মাষ্টার্স ডিগ্রী প্রদান করা হয়।

কানাডায় কানাডীয় বনবিদ্যা ইনস্টিটিউট কর্তৃক এর অধিভুক্ত মহাবিদ্যালয় ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রমসহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদেরকে রৌপ্য অঙ্গুরীয় প্রদান করা হয়ে থাকে।

অনেক ইউরোপীয় দেশ, বলোনিয়া প্রক্রিয়া এবং ইউরোপীয় উচ্চতর শিক্ষা এলাকার আবশ্যক শর্ত অনুসারে বনবিদ্যার উপর হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে থাকে।

বন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ হল একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেটি বিশ্বব্যাপি বনবিজ্ঞানের প্রয়াসগুলোকে একটি সাধারণ মঞ্চে নিয়ে আসে। বননীতি শিক্ষা নেটওয়ার্কের মতোন প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বন রাজনীতিকে সহজসাধ্যকরণ এবং এ বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদানে নিবেদিত থাকে।

তথ্য সূত্রঃ দলীয় ।

Hindi Shayari

hindi love shayari